কৃষকদের দীর্ঘ দিনের জিম্মিদশা কাটালেন আম্বিয়া সুলতানা 

মিঠুন  গোস্বামীঃ

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নির্বাহী কমকর্তা আম্বিয়া সুলতানা উপজেলার প্রতিটি হাটবাজারে একাধিক পরিচালনা করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ওজনে কারচুপি করার অপরাধে বিভিন্ন আড়তদারকে ভ্রাম্যমান আদালতে জরিমানা করেন।

শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ৭.১৫ মিনিটে নারুয়া বাজারে গিয়ে বাজার কমিটির মাধ্যমে আড়তদার ও কৃষকদের সাথে কথা বলার পর তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সন্দেহ দূর হয়। তারপর উভয়পক্ষ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেনাবেচা করে। প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক বাজার কমিটি কর্তৃক আগে থেকে মাইকিং করায় আজকের বাজারে শতভাগ ডিজিটাল নিক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। কৃষকের মুখের হাসি ছিল আজকের অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

নারুয়া বাজারে ৩ টি জুতার দোকান খোলা থাকায় ৩০০ টাকা করে মোট ৯০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া বাজারে আগত ক্রেতা বিক্রেতাদের মাঝে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।আজকের অভিযানে সহযোগিতা করেছে বালিয়াকান্দি থানা পুলিশের সদস্যগণ ও সংশ্লিষ্ট বাজার কমিটির সদস্যগণ।

 
উল্লেখ্য, সামাজিক  যোগাযোগ  মাধ্যমে কৃষকদের আড়তদার  কতৃক জিম্মির কথা জানতে  পারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আম্বিয়া সুলতানা, পরে বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কয়েকজন আড়তদারকে ভ্রাম্যমান আদালতে জরিমানা করেন। কৃষকদের দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা কাটাতে এমন অভিযান পরিচালনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ সর্ব মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। গত বছরের অক্টোবর মাসে তিনি বালিয়াকান্দিতে যোগদান করেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (২১ এপ্রিল) উপজেলার সমাধিনগর বাজারে মন প্রতি ৩ কেজি বেশি নেয়ায় ৩ জন আড়তদারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বৃহস্পতিবার সোনাপুর বাজারে একই অপরাধের দায়ে ৪জন আড়তদারকে ২২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ডিজিটাল ওজন পরিমাপক ব্যবহার না করে পুরাতন নিক্তি ব্যবহার করায় ৯টি নিক্তি জব্দ করা হয়। শুক্রবার সকালে নারুয়া বাজারে অভিযান পরিচালনা করে সঠিক ওজনে ক্রয়-বিক্রি হওয়ায় আড়তদারদের অবগতির জন্য করা হয় মাইকিং। কৃষকদেরকেও সচেতন করা হয়। এছাড়া লকডাউনের সময় সরকারি বিধি মেনে চলার জন্য জনসাধারণের মাঝে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাস্ক বিতরণ করা হয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না আসতে অনুরোধ করা হয়।
ওজনে কারচুপিতে অভিযান পরিচালনা করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন ইউএনও আম্বিয়া সুলতানা। ‘অনেকেই পোষ্ট করেছেন যুগ যুগ ধরে চলা অনিয়মের অবসান হয়েছে। এই মহতী কাজের সূচনার জন্য কৃষকদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন কেউ কেউ। কয়েকজন লিখেছেন আসলে কৃষকদের দেখার কেউ নাই এই প্রথম কাউকে কৃষকদের পক্ষে পেলাম। একাধিক ব্যক্তি পোষ্টের কমেন্টে লিখেছেন চলমান অভিযানে আল্লাহর নিকট প্রাণ খুলে দোয়া রইলো স্যার আপনার জন্য।’
নারুয়া বাজারে পিঁয়াজ বিক্রি করতে আসা নিজাম হোসেন, জালাল সেখ, হাবিবুর রহমানসহ বহু সংখ্যাক কৃষক বলেন, বালিয়াকান্দি কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় এখানে প্রচুর পরিমানে পেঁয়াজ পাওয়া যায়। এসব পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। ৪০ কেজিতে এক মণ। কিন্তু আমাদের কাছ প্রতি মণে অন্তত দুই থেকে তিন কেজি বেশি নেওয়া হয়। অর্থাৎ ৪৩ কেজিতে এক মণ ধরা হয়। কোন কোন হাটে ৪৫ কেজিতেও মন ধরা হয়। দীর্ঘদিন এমন অনিয়মে এটা একটা রীতিতে পরিণত হয়েছিলো। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর দীর্ঘদিন এমন কান্ডে তারা এক ধরনের জিম্মি হয়ে গিয়েছিলো। আমরা এটাকে নিয়ম হিসেবেই ধরে নিতাম। তবে সাংবাদিকদের লেখনির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আম্বিয়া সুলতানা স্যার অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন হাটবাজারে কয়েকজন আড়তদারকে জরিমানা করেছেন। কৃষকদের কথা ভেবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করায় তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য শুভ কামনা জানান। তারা অভিযান চলমান রাখার দাবীও জানান।

সমাধিনগর গ্রামের জীবন বিশ্বাস জানান, পিয়াজের সিজনে প্রায় শত মন পিয়াজ বিক্রি করি। মন প্রতি ৩-৫ কেজি বেশি নেয়া হয়। কোন প্রতিবাদ করলে লাঞ্চিত হতে হয়। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এমন অভিযানে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। আমরা সচেতন হয়েছি। পরবর্তীতে কোন আড়তদার এমন জিম্মি করতে চাইলে আমরা প্রশাসনকে জানাবো। আশা করছি অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রাখবে প্রশাসন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আম্বিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা আসলে কারও প্রশংসা পাওয়ার জন্য কাজ করি না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মচারি হিসেবে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমি সর্বদা নিয়ম মেনে পালন করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। উপজেলার বিভিন্ন হাটাবাজারে প্রতি মণে আড়াই থেকে তিন কেজি বেশি নেওয়া ওই এলাকায় একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিলো। কোথাও কোথায়ও ৫ কেজি বেশি নেয়ারও অভিযোগ ছিলো। বিষয়টি জানার পর কয়েকটি বাজারে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হয়েছে। ডিজিটাল ওজন পরিমাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আড়তদার এবং কৃষকদের বিষয়টি অবগত করার জন্য করা হয়েছে মাইকিং। শুধু ওজনে কারচুপিই নয় ভোক্তা অধিকার রক্ষায় প্রশাসন সজাগ রয়েছে। এক্ষেত্রে জনসাধারণকে তথ্য দিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা করাসহ আরও সচেতন হতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।

Please follow and like us:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here