প্রবীণ, এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশুদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলেছে বগুড়া টিএমএসএস

“করোনাও হার মেনেছে তাদের প্রশান্তির কাছে”
প্রবীণ, এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশুদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলেছে বগুড়া টিএমএসএস

-সঞ্জু রায়: কোভিড-১৯ কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সারাদেশে যখন আজ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ তখন মানবিকতার কাছে করোনার এক অদৃশ্য পরাজয় হয়েছে বগুড়া টিএমএসএস রিলিজিয়াস কমপ্লেক্স এর আওতাধীন অটিজম ও প্রতিবন্ধী স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রবীণ নিবাস ও এতিম শিশুদের আশ্রয়স্থল এতিমখানা, মাদ্রাসাসহ প্রায় আড়াই শতাধিক অসহায় মানুষের প্রশান্তির কাছে। বিশ্বব্যাপী করোনা হলেও এদের সেবাযতেœ ত্রæটি হয়নি বিন্দুমাত্র কারণ ওই স্থানই যে এখন তাদের আশ্রয়স্থল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এতগুলো মানুষ একটি ক্যাম্পাসে থাকলেও করোনার এই দীর্ঘ সময়ে কেউ নুন্যতম অসুস্থও হয়নি যা সৃষ্টিকর্তার এক পরম আর্শীবাদ।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মা-বাবাহীন কোমল শিশুগুলো পরম আনন্দে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের লেখাপড়া, খেলাধুলা, প্রার্থনা/নামাজ, বিনোদন এর জন্যে নানা কো-কারিকুলাম কার্যক্রমে অংশগ্রহণসহ দৈনন্দিনের সকল কাজ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অটিজম ও প্রতিবন্ধী স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে মোট ১৬৭ জন শিক্ষার্থী থাকলেও করোনার শুরু থেকেই এখানে আবাসিকে রয়েছে প্রায় ৫৬ জন শিক্ষার্থী যাদের মাঝে অটিস্টিক, সেরিব্রাল পাল্সি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, ডাউন সিনড্রোম, বাক ও শ্রবণ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও মাইক্রো সেফালাসে ভোগা শিশুরাও রয়েছে। এছাড়াও প্রবীণ নিবাসে রয়েছে ৩৯ জন যেখানে ৬ জন আছেন পুরুষ বাকিরা নারী, এতিম ও দুস্থ শিশুদের আশ্রয়স্থল টিএমএসএস আলিম মাদ্রাসায় আছে ৪৩ জন এবং ঠেঙ্গামারা এতিমখানা ও নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায় বর্তমানে আবাসিকে রয়েছে ১১৪ জন সবমিলিয়ে প্রায় আড়াই’শ মানুষের এক ছোট্ট প্রশান্তির জগত বিরাজ করছে এই স্থানে। যাদের সকলে ৩ বেলা পাচ্ছে সুষম খাবার, নাস্তা, ফলমূলসহ পরিধানের পোষাকও। আবার প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়মিত দেয়া হচ্ছে ফিজিওথেরাপিসহ চিকিৎসাসেবা। সারাবিশে^ চলমান মহামারী থেকে রক্ষায় এই নিষ্পাপ শিশুরাই করোনার শুরু থেকে প্রতিদিন পবিত্র কুরআন খতম দিচ্ছে সকলের মঙ্গল কামনায়।
টিএমএসএস অটিজম ও প্রতিবন্ধী স্কুল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) সাঈদ যুবায়ের পিনুর সাথে কথা বললে তিনি জানান, এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা কোন দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই কারণ অধ্যায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তারা অর্জন করেছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পুরস্কার। করোনাকালীন সময়ের শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানের স্টাফরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিবিড় যতেœ আবাসিক শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও সার্বিক সেবাদান কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। তিনি বলেন কোন করুণা নয় এই এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশুরা সৃষ্টিকর্তার পরম ¯েœহের তাই উৎসাহ দিয়ে তাদের পাশে মানবিক হয়ে দাঁড়ালে তা হবে সর্বোচ্চ আত্মপ্রশান্তির।
টিএমএসএস রিলিজিয়াস কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা রাকিবা সুলতানার সাথে কথা বললে তিনি জানান, অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগমের আবেগ ও ভালবাসার জায়গা এই রিলিজিয়াস কমপ্লেক্সে থাকা সকল এতিম, প্রতিবন্ধী, দুস্থ শিশু ও প্রবীণ সদস্যরা। তার নেতৃত্বেই তারা প্রয়াস করে যাচ্ছেন সকলের সন্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাওয়ার। তাদের কার্যক্রমের উপর আস্থা রেখে বিভিন্ন সময় সরকারি দপ্তর থেকেও ২জন প্রবীণ সদস্য, ৫ জন সাধারণ শিক্ষার্থী, প্রায় ৭ জন প্রতিবন্ধী শিশু তাদেরকে হস্তান্তর করা হয়েছে যারা বর্তমানে সেখানেই রয়েছে এবং ভাল আছে। তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিকালেও পাঠদানের পাশাপাশি শিশুদের সমসাময়িক সকল শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে এখানে। আবার একঘেঁয়েমি দূর করতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের কর্মব্যস্ত রাখতে তাদের দেয়া হচ্ছে কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ, শেখানো হচ্ছে হস্তশিল্পের কাজ এছাড়াও হাতে ভাজা মুড়ি প্যাকেটিংও করছে শিক্ষার্থীরা যা থেকে প্রাপ্ত অর্থও ব্যয় হচ্ছে তাদের পিছনেই। শুধু তাই নয় প্রায় ১ বছর যাবত তাদের একটি মানবিক উদ্যোগে সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত ‘খাবার ঘড়’ এর মাধ্যমে প্রতিদিন ১’শ অসহায় ও দুস্থ মানুষেরা পাচ্ছে একবেলার সুষম খাবার যা প্রস্তুত এবং সকল সেবা প্রদানে সেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন সেখানে থাকা প্রবীণ সদস্যরা যাতে তারাও বেশ আত্মতৃপ্ত।
এ প্রসঙ্গে রাকিবা সুলতানা আরো বলেন, টিএমএসএস পরিবার এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত সকল কার্যক্রম তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর প্রতিনিয়ত তাদের পাশে রয়েছে। এছাড়াও তিনি মানবিকতার স্বার্থে পবিত্র এই শিশুদের বেড়ে উঠার পথে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে সমাজের সকলের প্রতি উদ্বার্ত আহŸান জানান।

Leave a Reply