আমারে চিনিনে আমি’-

আমারে চিনিনে আমি’-

১৪০০ সাল না এলে আমি সত্যি নিজেকে চিনতে পারতাম না। সময় নিরাসক্ত ভাবাবেগে এগিয়ে চলেছে কোন অচিনের পানে। আর যখন ভাবি সত্যি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ি। স্বাধীনতা উত্তর পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পালিত হতো সাড়ম্বরে ‘রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী’ আর কবিতা আবৃতি করে আমরা ভাইরা কতো যে পুরস্কার পেয়েছি! এক আলমারিতো পুরস্কারের বইয়ে ভরে গিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের ১৪০০ সাল কবিতা যখন পড়তাম তখন তার পরতে পরতে ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’র কথা রবীন্দ্রনাথের চোখে দেখার চেষ্টা করতাম!

আমার তখন পূর্ণ যৌবন।১৪০০ সাল দ্বারপ্রান্তে সমুপস্হিত-
রবিঠাকুরের কবিতার আবহে বাংলাদেশে সেজেছে নতুন সাজে। ১৪০০ সাল বরণে আবেগের উচ্ছাসে বাঙালি চিত্ত বিমোহিত। নানা আয়োজনে পালিত হবে ১৪০০ সাল। রমনা বটমূল, চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪০০ সাল আবাহনে কি বিপুল সমারোহ।

আমি তখন বেক্সিমকো গ্রুপের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সয়েলটেকে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। আমি আর সেলিম বিয়াই মিলে ঠিক করলাম ঃ এসময় ঘরে বসে থাকবার নয় – ১৪০০ সাল নব আনন্দে জাগো বাংলার চিরচেনা আলো-বাতাসে নতুন করে নিঃশ্বাস নিতে প্রাণ আকুল হয়ে উঠলো।

সবে বিয়ে করেছি। গিন্নিকে নানা ভাবে বুঝিয়ে আমি আর সেলিম বিয়াই ‘অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি’ পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সেখান থেকে শোভাযাত্রা বের হবে রমনা বটমূল পর্যন্ত- দিনের প্রথম কর্মসূচি – তারপর বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে মিশে যাবো আমরা। পৌঁছানোর আগেই দেখি নানা বর্ণিল সাজে মিছিলের যাত্রা শুরু। একটা গরুর গাড়িতে গাড়োয়ানের বেশে দেখি শংকর সাঁওজাল- বিপুল উৎসাহে মিশে গেলাম আনন্দ উৎসবে।
এক পরিপূর্ণ বাঙালির মন্দ্রিত উচ্ছ্বাস মনকে শাণিত করে তোলে গর্বিত অহংকারে। গানের ছন্দে আনন্দে কোন ফাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে গেছি জানিনে- কিন্তু ১৪০০ সাল যেন বাঙালির বাঙালিত্বের ভাব রস তালে হাজার বছরের মহিমাকীর্তন করে গেল এক মুহূর্তে –

এত আনন্দ!! বাঙালি মেলবন্ধনে দু’কূল প্লাবিত ভাবাবেগে তরঙ্গায়িত তখন চতুর্দিক – দোলায়িত জীবনের সব জড়তা, অবসন্নতা। মোহাবিষ্টের মতো বাঙালি জীবনের অনুপম সৌন্দর্য প্রানভরে উপভোগ করছি – এর মধ্যে মিছিল কখন শাহবাগের মোড়ে এসে পৌঁছেছে খেয়ালই করিনি।
সেখানে মিছিলের ছেলেরা তখন জীর্ণ পুরাতনকে ভাসিয়ে দুজনে দুজনের হাত ধরে ঝড়ের মত উদ্দাম নৃত্যেমগ্ন যা শুধু চোখ দিয়ে উপলব্ধি করা যায়! এ সংক্রামক নৃত্যছন্দে আমি স্থির থাকতে পারিনে – একজন এসে টান মেরে আমাকে নৃত্যরতদের মাঝে নিয়ে গেল।
মোহিনী বাংলার ১৪০০ সালের প্রথম সূর্যালোক গায়ে মেখে অসামান্য নৃত্যে ছন্দায়িত হয়ে উঠলাম। হাজার হাজার মানুষের করতালিমুখর উচ্চকিত উল্লাস ধ্বনি আমাদের যেন নবপ্রাণ দান করল!! প্রাণের আবেগ যেন থামতেই চায় না। আমার নাচ দেখে সেলিম বিয়াইয়ের চোখ তো ছানাবড়া – এত অবলীলায় এত প্রাণপ্রাচুর্য যে মানুষকে নৃত্যছন্দে ঐশ্বরিক সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয় তা শুধু আমার এ বাঙলায়ই সম্ভব। নাচ শেষে যার সাথে নেচেছিলাম প্রাণের আনন্দে সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো – লাজুক সেলিম বিয়াই আমার প্রাণশক্তিতে হতবাক হয়েছিল -পরে হাসতে হাসতে বলেছিল আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করলেন!! আমি বলেছি, আমার বাঙালিত্ব আমায় নাচায় আমার বাঙালিত্ব আমায় কাঁদায় আমরা বাঙালি আমরা কিংবদন্তি।

মন গেয়ে ওঠে –

আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি
আমার কবিতাখানি কৌতুহলভরে
আজি নব বসন্তের প্রভাতের আনন্দের লেশমাত্র ভাগ আজিকার কোনো ফুল
কোন রক্তরাগ পারিব কি পাঠাইতে তোমাদের করে!
আজি হতে শতবর্ষ পরে!!

সেদিনের সেই প্রভাতবেলায় আমি বলেছিলেম, রবি ঠাকুর তুমি পেরেছ -পেরেছ বাঙালিকে আবার জাগরিত করে তুলতে মোহ কালিমা ঘুচায়ে ~

লেখকঃ প্রকৌশলী নাসিম রেজা নূর।

Please follow and like us: