আমার দেখা “ওস্তাদ ভাই”

জনাব সিরাজুল হক চৌধুরী “ওস্তাদ ভাই” আবহমান বাংলার অমর গাঁথা মহাকাব্য। ছন্দময় বৈচিত্রতায় ভরা একজন ব্যাক্তি, একজন মানুষ। কুষ্টিয়া অঞ্চলের ইতিহাসে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ, লালন সাঁইজী, মীর মোশাররফ, রোকনুজ্জামান “দাদা ভাই” এমন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যাদের জীবন প্রবাহ নিয়ে গবেষণা চলমান তেমনিভাবে আবহমান বাংলার নিবিড় পল্লী জনপদ মাঠে প্রান্তরে ছুটে চলা মানুষটির বহুমাত্রিক কর্মজজ্ঞ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
শুধুমাত্র বৃহত্তর কুষ্টিয়া কেন ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, রংপুরসহ সমগ্র উত্তর বঙ্গের তথা সমগ্র বাংলাদেশে সুসংগঠিত করেছিলেন “বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী”। প্রতিষ্ঠাতার দ্বায়িত্ব গ্রহণ করে ভিন্নধারার কৌশলে প্রশিক্ষিত করেছিলেন এ বাহিনীকে, যাতে ছিল প্রতিরক্ষা আনন্দ বিনোদনের মত ছন্দময় এবং দৃষ্টি নন্দন নানাবিধ বহুমাত্রিক উপাদান। যাতে ভেসে উঠেছিল আবহমান বাংলার জনপদের হৃদয়গ্রাহী জীবন বৈচিত্রের চিত্র।
এ মানুষটিকে জানা যেমন সহজ চেনা বুঝা কঠিন ছিল বটে। চলন বলন লিখনিতে জীবন ধারন ছিল বেশ অনুকরণীয়। সাংগঠনিক দক্ষতার কারনে “ওস্তাদ ভাই” ছিলেন রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কার প্রাপ্ত, তাছাড়া দাদা ভাই, মিয়ে ভাই, ওস্তাদ, মামা, দাদু বিভিন্ন নামে ধর্ম বর্ণ জাত গোষ্ঠী নির্বিশেষে ছিলেন অতি আপনজনের চেয়েও আপন আত্মীয়ের চাইতেও পরম আত্বীয়। জীবদ্বশায় গরীব, বেকার, বয়স্ক, বিধবাসহ নানা শ্রেণীর সরলপ্রাণ মানুষকে সাহায্য সহায়তা প্রাদনে ছিলেন অতি উদার। বিমুখ হয়নি কেউ। শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবকদের কথা ভেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সরকার অনুমোদিত “কুষ্টিয়া টেকনিক্যাল স্কুল”। যেখানে পরম আপনজনের মত সক্রিয় থেকে হাতে কলমে কম টাকায় মটর ড্রাইভিং, অটোমোবাইল টেকনোলজি, রেডিও টেকনোলজি, Tailoring, মৃত শিল্পসহ সৃজনশীল কাজ শেখার সূবর্ণ সুযোগ ছিল অবারিত। পরবর্তী পর্যায় সে সকল ছাত্র খুজে পেয়েছে উন্নত জীবন জীবিকার সন্ধান। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকেই। স্বাধীনতা দিবসসহ সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দ্বায়িত্ব পালন করতেন। তিনি জেলা সিভিল ডিফেন্স এর নেতৃত্ব দিতেন, তীঁর ধনুক বল্লম ঢাল তলোয়ারসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে সংগঠিত আকর্ষনীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালায় নেতৃত্ব প্রদানে একনিষ্ঠ ছিলেন। গুটি পোকা থেকে রেশম চাষ ছিল তাঁর অনন্য সখের একটি সামাজিক কাজ।
স্কুলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ কালীন ছাত্রদের প্রভাতের শারীরিক কসরতে আর লাঠির ঠক ঠক শব্দ এবং ছন্দ তালে ব্রতচারী সঙ্গীতে ঘুম ভাঙ্গত মজমপুর বাসীর। সে সব স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত তাই কেবলই মনে হয় তখন জীবন কত সুন্দর ছিল। আমার ব্যক্তিগত জীবনের মূলে তিনি যেমন ছিলেন মহান দীক্ষাগুরু, ¯েœহশীল অভিভাবক, নির্মোহ মমতায় প্রভাবিত করেছিলেন আমার ক্ষুদ্র জীবন প্রবাহকে। গধুলীর ছায়া পথের মত জীবন খাতার প্রতি পাতায় লিপিবদ্ধ আছেন, থাকবেন আজীবন। “ওস্তাদ ভাই” রচিত জীবনের শেষ গল্প “জীবনের আকে বাঁকে” লিখে গেছেন তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের কিছু বাস্তব কথা কিছু গল্প। সমাজের অসহায় দুখি মানুষের আপনজন সৃষ্টিশীল কর্মময় জীবনের অধিকারী পরোপকারী মানুষটি আজ নেই। কিন্তু তার অমরকীর্তি আজও অমলিন সারা বাংলায়। আবহমান গ্রাম বাংলার লাঠি খেলার মহান সংগঠক এমন গুনিজনকে স্মরণ করছি বিন¤্র শ্রদ্ধাভরে, প্রার্থনা করছি তার বিদেহী আত্মার পরম শান্তি। প্রকৃতির পরশে এমন জীবনের মানুষ আর একবার আসুক, বার বার আসুক ছোট ছোট গাঁয়ের দিগন্ত জোড়া জনপদের মেঠোপথ ধরে এ সোনার বাংলায়।

লেখক: রাগিব আহামেদ (ছদ্ম নাম),
প্রিয় সংগঠনের সহায়ক

Please follow and like us:

হালনাগাদঃ