একজন পথোশিশু প্রেমিকের গল্প

একজন পথোশিশু প্রেমিকের গল্প

খুব দ্রুত হাটছিলাম ।গুলশান-১ পোস্ট অফিসের উলটো দিকের ২৩ নাম্বার রোডের একটি অফিসের উদ্দেশ্যে। চাকরিজীবনের প্রথম অফিস। প্রায় তিনটা বাজে বাজে। খুব দ্রুত হাটছিলাম কারন একজন সন্মানিত বীমাগ্রাহককে সময় দিয়েছিলাম বিকাল তিনটার। ভদ্রলোক গতসপ্তাহে হার্ট এটাক করে স্কয়ার হস্পিটালে ভর্তি ছিলেন। পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার রিঙ লাগানোর পরামর্শ দিলে সাথে সাথেই তিনি রিং লাগিয়ে নিয়েছেন। সে অনুযায়ী ক্লেইম সাবমিট করার জন্য কাগজপত্র তার অফিস থেকে নেবো বলেই এতো তাড়া করে হাটা।এরই মধ্যে ক্যাম্পাসের এক বন্ধুর সাথে দেখা,সে তার কলিগকে নিয়ে লাঞ্চের পর বিড়ি ফুকানোর জন্য অফিস থেকে বের হতে না হতেই মুখোমুখি তিনজন। কুশলাদি শেষ করে খুব তাড়া বলে বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলাম।এরই মধ্যে কোত্থেকে যেন কয়েকজন পথশিশু আমাকে ঘিরে ধরলো।দুপুরের খাবার খাওয়ার আবদার করলো। তখনও বন্ধু তার কলিগকে নিয়ে আমার সাথেই ছিলো। ওদের সাথে বলাকওয়া করতে করতেই হাটতেছিলাম।ওরা হেমিলিওনের বাশিওয়ালার গল্পের মতো করে আমার পিছেপিছে হাটতেছিলো। বিড়ি ততোক্ষনে শেষ প্রায়। বন্ধু খুব মজা পাচ্ছিলো। পকেট থেকে ফোন বের করেই ক্লিক ক্লিক।
এই শিশুদের আবদারে রাজি হয়ে ঘুরে আবার পোস্ট অফিসের দিকে যাচ্ছি।সময় কম,খুব কাছে কোথায় খাবার হোটেল বলতে না বলতেই একজন পথচারী বললেন পোস্ট অফিসের দক্ষিন গেটের কথা। খাবার হোটেলের দিকে যেতে যেতে শিশুরা কে কি খাবে, পেটভরে খাবে, রান খাবে, গরুর গোস্ত খাবে ইত্যাদি বলতে বলতেই হোটেল। হোটেলের বাইরে টেবিল নিয়ে বসে আছে ম্যানেজার।প্রায় দশবছরের পরিচিত ছেলে, একসময় হোটেলের খাবার পরিবেশন করতো। আমাকে দেখেই ভালোলাগার হাসিমুখে ‘ভাই এহন দেহি আহেন না,এরা কি কয়?’ সময় বাচাতে মানিব্যাগ থেকে একহাজার টাকার একটা নোট ম্যানেজারের হাতে দিয়ে বললাম ওরা ওদের ইচ্ছামতো খাবে, যদি আরও টাকা দিতে হয় আমি ফেরার সময় দিয়ে যাবো। খাবারের অর্ডার শেষ না হতেই একজন বলে উঠলো ‘স্যার, আমরা ভর্তা আর ডাল দিয়ে খামু,দুইশ ট্যাহা হইলেই চলবো’আমি বললাম না,তোমরাতো এতক্ষন বল্লা ইচ্ছামত খাবা,এখন আবার ভর্তা আর ডাল কেন? তোমরা যা যা ইচ্ছা খাও বলে চলে আসবো,এমন সময় ওদের একজন বলে উঠলো ‘আমরা খামুনা, স্যার বেশী বোজে,চল যাইগা’ বলেই খাবার হোটেল থেকে এক এক করে ছয়জনই শরে গ্যালো!

অসুস্থ ভদ্রলোক আমার অপেক্ষায়,আমাকে কাগজপত্রগুলো দিয়েই সে অফিস থেকে বের হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার দেরী না করে ম্যানেজার ছেলেটার কাছথেকে টাকাটা ফেরত নিয়ে আবার হাটা দিলাম। কিছুদুর এসে দেখি ফুটপাতের কিনারায় লাইন ধরে প্রত্যেকেই বসে আছে। পা দুলিয়ে দুলিয়ে নানারকম কথাবার্তা ওরা বলছে। ওদের দিকে না তাকিয়ে কোনোরকম বাক্যব্যয় না করেই গন্তব্যের দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে সোজা সামনের দিকে হাটছিলাম।কিছুদুর যেতে যেতে শুনলাম ওরা কেউ জোড়ে স্যার স্যার বলে ডাকছে আবার কেউ কেউ খুব নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করছে আর আমাকে ফলো করে করে আসছে! কোনোরকমে অফিসের গলিতে ঢুকে আরও দ্রুতবেগে সোজা সেই অফিসে ঢুকে গেলাম।
শেষতক অযথা একটা উটকো ঝামেলার ভয় মনের ভেতর নড়াচড়া করতে লাগলো। একধরনের হন্তদন্ত হয়ে ভদ্রলোকের রুমে ঢুকলাম।তার রুমে আরও তিনজন বসেন।তাদের মধ্যে দুইজন আপাও আমার গ্রাহক।প্রত্যেকেই নিজ নিজ ডেস্কে বসে কাজ করছিলেন। অসুস্থ ভদ্রলোক তার অফিসের গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স এর ক্লেইম ফরম ফিলাপ করছিলেন।আমার উপস্থিতিতে তিনজন ই একসাথে খুশি হলেন। আমি কাজের আলাপের আগেই নিজেকে স্বাভাবিক করার জন্য তাদেরকে গুলশানের সেই ছয়জন শিশুর গল্পটা বললাম। আপাদুইজন চোখ বড় করে শুনলেন,ভদ্রলোক গম্ভীর কন্ঠে বললেন তুমি চলে এসে ভালো করেছো আর তার অন্য কলিগ জানতে চাইলেন শিশুদের বয়স কত।
শিশুরা বেড়ে উঠুক এক এক জন একজন ভালো মানুষ হয়ে।তাদের জন্য সুযোগ হোক ভালোমানুষ হয়ে বড় হওয়ার।
( শিশুরা মুলতঃ কীসের জন্য এরকম করলো-বোধগম্য নয়, তবে খুব ইচ্ছা জানার। বামহাত উচিয়ে আমার সাথে কথাবলার ছেলেটাই ওদের লিডার।)

রীয়াল জাহিদ, ০৬.০২.২০২০।

 

Please follow and like us: