অবহেলা নয়, প্রতিবন্ধীদের জন্য চাই যথাযোগ্য সম্মান  —– তারেক মিয়া

সাধারণত শারীরিক  বা মানসিক দিক থেকে  স্বাভাবিক নয় এমন কি শারীরিক  বা মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও যাদের রয়েছে অপূর্ণতা, প্রতিবন্ধকতা— তাদেরই মূলত প্রতিবন্ধী বলা হয়। এক্ষেত্রে কেউ কেউ দূরারোগ্য ব্যাধি, দুর্ঘটনা বা যুদ্ধকবলিত হয়ে প্রতিবন্ধী হচ্ছে আবার কেউ কেউ জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী হয়ে পৃথিবীর বুকে আগমন করছে।
প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বরকে বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ বছর ও তার ব্যতিক্রম নেই। ১৯৯২ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। এবছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ২৮ তম বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। মূলত শারীরিকভাবে অসম্পূর্ন মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগীতা প্রদর্শন ও তাদের কর্মকান্ডের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই এই দিবসটির সূচনা হয়।
প্রতিবন্ধী মানুষের রয়েছে নানা রকম প্রকারভেদ।শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী,বাক প্রতিবন্ধী,বুদ্ধি প্রতিবন্ধী,এমন কি বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে বয়স, লিঙ্গ, জাতি,সংস্কৃতি বা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী এই মানুষ গুলো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবন যুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধা হিসেবে জীবনকে পরিচালনা করছে।
দুঃখ জনক হলেও এটাই চুরান্ত বাস্তবতা যে, প্রতিবন্ধী মানুষের  জীবনে  রয়েছে পদে পদে বাধা। এরা পৃথিবীর রং, রূপ ও রসের বিলাস-বৈচিত্র্যের বৃত্ত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। স্বাভাবিক মানুষের ন্যায় সুন্দর এই জীবনটাকে যথাযথ ভাবে  উপভোগে বরাবরই  অক্ষম। দিকে দিকে যে বিচিত্র কর্মধারা নিত্যপ্রবাহিত, সেখানে যোগদানের ক্ষেত্রেও  তারা প্রতিনিয়ত অবহেলিত ও নানা প্রকার প্রতিবন্ধকতার শিকার। ফলে ধীরে ধীরে এদের জীবনে আসে হতাশা। অদৃশ্য শিকলে হাতদুটো যেন বাঁধা পরে যায় অজান্তেই।  অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় সর্বদিক ।
 ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে এ আইনটি বাতিল করে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের সুরক্ষা প্রদানের অনন্য দলিল।
তাছাড়াও, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫, ১৭, ২০ এবং ২৯ অনুচ্ছেদে অন্যান্য নাগরিকদের সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমসুযোগ ও অধিকার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রশ্ন থেকে যায় আজও কি অন্যান্য নাগরিকদের সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমসুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত হয়েছে?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  সমাজসেবা অধিদফতর এর সর্বশেষ হাল-নাগাদ তথ্য অনুসারে জানা যায়,
সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ দায়-দায়িত্বের অংশ হিসেবে ২০০৫-০৬ অর্থ বছর হতে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি প্রবর্তন করা হয়। শুরুতে ১,০৪,১৬৬ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জনপ্রতি মাসিক ২০০ টাকা হারে ভাতা প্রদানের আওতায় আনা হয়।
২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ জন এবং জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার ২৫০ হিসেবে বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ৬০.০০ কোটি টাকা।
২০০৯-১০ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৬০ হাজার জনে, মাসিক ভাতার হার ৩০০ টাকায় এবং বার্ষিক বরাদ্দ ৯৩.৬০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
২০১০-১১ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৮৬ হাজার জনে উন্নীত করা হয় এবং মাথাপিছু মাসিক ভাতা ৩০০ টাকা  হিসেবে বার্ষিক বরাদ্দ ১০২.৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৮ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মাসিক ৭৫০ টাকা হিসেবে ১৬২০ কোটি টাকা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন যে থেকেই যায়, এই অর্থ কি একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য যথেষ্ট? অবশ্যই যথেষ্ট নয়। তাই বলি, একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে কেবল প্রতিবন্ধী হিসেবে অনুগ্রহ নয় দিতে হবে মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান।
প্রতিবন্ধীদের যদি মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান ও সমঅধিকার ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা যায় তাহলে তারা দেশ ও জাতীর জন্য বয়ে আনতে পারে অকল্পনীয় সম্ভাবনাময় অর্জন । তাদের  অনেকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসাধারণ  প্রতিভা। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো  সম্ভব।  উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, স্টিফেন হকিং,জন ন্যাস,ক্রিস্টি ব্রাউন,ডেমোস্থিনিস,ভিনসেন্ট ভ্যান,ফ্রিডা কাহলো,হেলেন কেলার,মারলা রুনিয়ান,সুধা চন্দ্রন,এসব বিখ্যাত মানুষ শত প্রতিকূলতা পার হয়েও নিজেকে বিখ্যাত করেছেন সবার কাছে। নিজ আলোয় উজ্জল করেছেন গোটা বিশ্বকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো তাদের আটকে রাখতে পারেনি।  এসব বিখ্যাত ব্যক্তি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে বড় করে তোলে যেখানে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতা খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারে না।
 —– তারেক মিয়া, কলাম লেখক, দাম্মাম, সৌদি আরব
Please follow and like us: