বর্জ্য পদার্থ থেকে মিলবে নানা রকমের প্রাকৃতিক সম্পদ

দুই তরুণের বিস্ময়কর উদ্ভাবন

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে সে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন কর যাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তাদের উদ্ভাবন, গবেষণা ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে অত্যাধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। সেই যাত্রার জন্য কিন্তু কালক্ষেপণ নয়, তার প্রারম্ভন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। যেখানে বর্জ্য আমাদের দেশে একটি দুর্বিষহ অবস্থা আর সেই বর্জ্য থেকে এখন আর নয় দূষণ, বর্জ্য হবে পরিশোধন আর সেখান থেকে মিলবে নানা রকমের পরিবেশবান্ধব সব উপাদান। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অতিদ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে এই বর্জ্যরে পরিমাণ। প্লাস্টিকের ওপর আমরা এখন অনেকাংশেই নির্ভরশীল, ইচ্ছা করলেও আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে পারব না। আমরা দেখেছি এবং দেখছি কীভাবে সমুদ্রের প্রাণিকুল এই প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ শিকার হচ্ছে। এটা সত্যি বেদনাদায়ক, শুধু সমুদ্র নয়, আমরা যারা স্থলভাগে আছি তারাও ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার। বিশ্বের প্রায় দেশের সিটি করপোরেশনগুলো এই ক্রমবর্ধমান বর্জ্য নিয়ে প্রতিনিয়তই বিপাকে পড়ছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের সিটি করপোরেশনগুলো। এই বর্জ্যকে যেখানে ডাম্পিং করা হচ্ছে, তার আশপাশের জমিতে ভালো ফসল হচ্ছে না। পরিবেশে মিথেনের মতো বিষাক্ত গ্যাসসহ কার্বন মনো-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসও ছড়ায়। আর কিছু দিন পর দেখা যায় ওই ডাম্পিং করা জায়গাগুলোতে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সেখানকার বহুতল ভবনগুলো সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে নিতে এবং ওই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের চিন্তাভাবনা মাথায় রেখে দুই বন্ধু ও তরুণ উদ্ভাবক এইচ এম রঞ্জু এবং পীযূষ দত্ত, ২০১৭-১৮ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে ভর্তি হয়। তাদের দুজনের মধ্যে খুব দ্রুতই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তারা একদিন গল্পে গল্পে ঢাকা শহরের বর্জ্য সমস্যা নিয়ে কথা বলছিল, হঠাৎ দুজনে সিদ্ধান্ত নিল তারা যেহেতু ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশলের ছাত্র, তাই এ বিষয়ে কাজ করবে এবং গবেষণা করে দেখতে চায় কীভাবে সমস্যার প্রতিকার করা যায়! এরপর তারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জরিপ করতে থাকে এবং একই সঙ্গে ইন্টারনেট থেকেও ডাটা সংগ্রহ করা শুরু করে  দেয়। কিছু দিন পর জানতে পারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্লান্ট আছে। তখন তারা চেষ্টা করতে থাকে কীভাবে এটাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় এবং দীর্ঘদিনের গবেষণার পর তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছায় এবং সম্পূর্ণ আলাদা ও পরিবেশবান্ধব একটা আধুনিক প্রযুক্তি উদ্বোধন করতে সক্ষম হয়। অন্যরা যেখানে নিয়মিত, আড্ডা, ক্লাস আর হাসিঠাট্টায় মুখর থাকত, তখন তারা ঘুরে বেড়াত বিভিন্ন ডাম্পিং এরিয়ায়। সমস্যাগুলো নিজ চোখে দেখত। আর কত প্রকার বর্জ্য কী পরিমাণে আছে তা নোট করত। আর বাসায় এসে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার উপায় বের করার চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত। আর অবশেষে স্বপ্নের প্রকল্পটি ABC Construction chemical company Ltd  এর সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে বর্তমানে একটি শার্টআপের মাধ্যমে। আর প্লান্টের আধুনিকরণ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশ অ্যাডভান্স রোবটিক রিসার্চ সেন্টার ও সার্বিক সাহায্য করেছে তাদের।

দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার পর এবং উপদেষ্টা মণ্ডলীর সার্বিক সহযোগিতায় একটা সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়। এটা সম্পূর্ণ কেমিক্যাল বেজড। সিটি করপোরেশনের কালেক্ট করা ময়লা আবর্জনা প্রথমে আমাদের গারবেজ ট্যাংকে ফেলতে হবে। এটি ম্যাগনেটিক বেল্টের সাহায্যে লৌহ জাতীয় কঠিন পদার্থকে আলাদা করবে। এরপর ময়লা আবর্জনা প্রথমে ক্রাসিংয়ের পর কাটিংয়ের মাধ্যমে ছোট টুকরায় পরিণত হবে। আমাদের অটোমেটিক সেপারেশন চেম্বারে প্লাস্টিক ও জৈব আবর্জনাগুলো আলাদা হয়ে দুটি আলাদা চেম্বারে প্রবেশ করবে। এরপর জৈব আবর্জনাকে কিছু কেমিক্যাল, ইস্ট-এর মাধ্যমে ফর্মেন্টেশন ঘটিয়ে প্রথমে বায়ো ইথানল এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত করা হয়, এরপর কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ড্রাই আইস এবং অবশিষ্ট জৈব আবর্জনাকে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জৈবসারে পরিণত করা হয়। আর প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থের জন্য প্রথমে প্লাস্টিককে ড্রাই চেম্বার এবং তারপর একে পাইরোলাইসিস চেম্বারে প্রবেশ করিয়ে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, চাপ এবং কিছু কেমিক্যালের মাধ্যমে প্লাস্টিককে ভেঙে ছোট শিকলে অর্থাৎ জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়াম গ্যাস, অ্যাক্টিভেট কার্বন, এবং হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে পরিবর্তন করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো এই প্লান্টে আমরা সব ধরনের প্লাস্টিককে ব্যবহার করা যাবে যেখানে বিশ্বের অন্য প্লান্টগুলো শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্লাস্টিককে পাইরোলাইসিস করে থাকে। আমরা বর্জ্য সমস্যার শুধু সমাধানই নয়, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এ গবেষণা কার্যক্রমে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের দুজন শিক্ষক তছলিম উর রশিদ ও মো. সাজেদুল ইসলাম এবং নাসার প্রকল্প সহায়ক, বাংলাদেশ অ্যাডভান্স রোবটিক্স রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা জিমি মজুমদারের তত্ত্বাবধায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। উদ্ভাবক দুই তরুণ বলেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে ইউরিয়া সারও তৈরি করা সম্ভব। আমাদের  জৈবসারে মৌলিক খনিজ উপাদানের শতকরা হার অনেক বেশি, যা মাটির গুণাগুণ ধরে রেখে করবে উর্বর।

বর্জ্য শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারাবিশ্বের একটা বড় সমস্যা। আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছি, এ থেকে পশুপাখি এমনকি সমুদ্রের প্রাণিকুলও রেহাই পাচ্ছে না, মানুষ তো আছেই। আর এ সমস্যা সমাধানের জন্য হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করছে সরকারি  বেসকারি উদ্যোক্তারা।

অথচ আমাদের দেশের তরুণ মেধাবীদের এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অর্থ ও সমৃদ্ধিতে বদলে যাবে দেশ এবং প্রমাণিত হবে তরুণরাই আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশ।

 

এই প্লান্টের উদ্দেশ্য

► বর্জ্য কোনো সমস্যা নয়, বর্জ্যই সম্পদ।

► শুধু গৃহস্থালির বর্জ্য দিয়েই বাংলাদেশের ৩০% জ্বালানি এবং সম্পূর্ণ জৈবসারের চাহিদা পূরণ করবে।

►  ৮ মাসের মধ্যে প্লান্ট ব্যয় উঠে আসবে।

 

এই প্লান্টের বৈশিষ্ট্য

►  সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।

► সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়।

► এখান থেকে নতুন করে আর কোনো বর্জ্য উৎপাদন হবে না।

►  প্লান্ট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, বিদ্যুৎ প্লান্ট নিজেই সরবরাহ করবে।

 

বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত পণ্যগুলো

►  জ্বালানি তেল

► পেট্রোলিয়াম গ্যাস

► ড্রাই আইস

►  বায়ো ইথানল

► অ্যাক্টিভেটেড কার্বন

► হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড

► জৈবসার

Please follow and like us: