শত সহস্র বছর জীবিত থাকার কৌশল-“ক্রায়োনিক্স”

এই ছবিটি সবার খুব চেনা হওয়ার কথা, তাই না? অনেক সাই ফাই মুভিতেই দেখায় যে একটা ক্যাপসুলে তরল নাইট্রোজেনে দেহ সংরক্ষণ করা থাকে, মানুষ শীতনিদ্রায় থাকে, এরপর তাকে জাগানো হয়। ঘন সাদা কুয়াশার মতো নাইট্রোজেন নির্গত হয়, মানুষ ধীরে ধীরে জীবিত হয়ে উঠে। জাফর ইকবালের বহু লেখায়ই এরকম আছে,মহাকাশ পরিভ্রমণের সময় শীতলঘরে শীতনিদ্রায় মানুষ একশো-দুইশো বছর কাটিয়ে আবার জেগে উঠে। কন্সেপ্টটি খুবই সহজ। ঠিক যেকারণে আমরা ফ্রীজে মাংস রাখি ঠিক একই আইডিয়া ব্যবহার করে মৃতদেহও অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। কারণ এত কম তাপমাত্রায় অণুজীবগুলো চলাফেরা করতে পারে না, তাই দেহও পচে না। কিন্তু তাই বলে যেকোন প্রাণকে এভাবে বছরের পর বছর সংরক্ষণ করে আবার পুনর্জীবিত করা সম্ভব? অবশ্যই, খুব সম্ভব! আমার ল্যাবে যে কৃমি নিয়ে কাজ করা হয়, Caenorhabditis elegans সংক্ষেপে C elegans, এমনিতে বাঁচে মাত্র ১২-১৮ দিন, বাট মাইনাস একশো ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে সংরক্ষণ করা গেলে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা যায়, এবং দরকার মতো পুনর্জীবিতও করা যায়! রাশিয়ান গবেষকরা সাইবেরিয়ার বরফের নীচে এমন কৃমির সন্ধান পেয়েছেন যেটি প্রায় বেয়াল্লিশ হাজার বছর ধরে শীতনিদ্রায় ছিলো! রিসার্চের কাজ করতে করতে হঠাত মনে হলো এ বিষয়ে চট করে কিছু লিখে ফেলি!
অতি স্বল্প তাপমাত্রায় শীতনীদ্রার এই কনসেপ্ট থেকেই মূলত মুভিতে ক্রায়োনিক্স বিষয়টি খুব জনপ্রিয়। আমেরিকা ও রাশিয়াতেও ক্রায়োনিক ইন্সটিটিউট আছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনের উপরে মানুষের দেহ এভাবে সংরক্ষণ করা আছে এবং প্রায় পনেরশোর উপরে মানুষের সাথে মৃত্যু-পরবর্তী সংরক্ষণের চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। তাঁরা এই আশায় হয়তো সংরক্ষণ করে রাখছেন যে ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো আবার তাঁদেরকে পুনর্জীবিত করবে, তাঁরা আবার এই পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতে পারবে।
এই পর্যায়ে এসে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, যে C elegans এর মতো এভাবে কি শীতনিদ্রায় পাঠিয়ে আবার জাগিয়ে তোলা সম্ভব? খুব সহজ এবং ছোট উত্তর হচ্ছে, “না”। কারণ হচ্ছে, কৃমির সাথে আমাদের সবচেয়ে বড় যে পার্থক্য, আমাদের দেহের গঠন খুবই জটিল। শীতল করার সময়ে দেহের তরল পদার্থ জমে ক্রিস্টাল হতে পারে যা টিস্যুতে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এরজন্য বর্তমানে ক্রায়োপ্রটেকট্যান্ট ব্যবহার করা হয় এবং খুবই ধীরগতিতে শীতল করা হয় যেন কোথাও কোন বরফ না জমে। কিন্তু এরপরেও সমস্যা থেকে যায়। আমরা জানি তাপমাত্রা কমলে সবকিছু সঙ্কুচিত হয়। একারণে অনেক জায়গায় ফ্র্যাকচার হয়ে যায়। নিউরাল নেটওয়ার্কের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, এবং শীতল করার সময়ও অনেক তন্ত্রের কার্যক্ষমতা জলাঞ্জলি দিতে হয়। তাই বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি সংরক্ষিত দেহগুলো পুনর্জীবিত করা তো দূরের কথা, অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণেরও ধারে কাছে যেতে পারেনি। আর বেশিরভাগ ড্যামেজই irreversible, অর্থাৎ আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব না। তারপরও গবেষকরা চেষ্টা করছেন যতটা নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা যায়। তাঁরা এবং তাঁদের ক্লায়েন্টরা এই আশায় বুক বেঁধে আছেন যে, ভবিষ্যতের অতি উন্নত কোন প্রযুক্তি তাঁদের শুধু জাগিয়েই তুলবে না, এই প্রক্রিয়ায় দেহে যে বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয় সেগুলোও সাড়িয়ে তুলবেন! মূলধারার বিজ্ঞানীরা অবশ্য ক্রায়োনিক্সকে সিউডোসায়েন্স ও টাকা পয়সার অপচয় বলে উড়িয়ে দেন। এই প্রক্রিয়া এতোই ব্যয়বহুল যে প্রতিষ্ঠানগুলো কতবছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারে সেটাই চিন্তার বিষয়। আর সুদূর ভবিষ্যতে সত্যি সত্যিই যদি এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনও হয়, তখন পৃথিবী কতটা বাসযোগ্য থাকবে সেটাও ভাবা দরকার।
Please follow and like us: