ঘুরে এলাম গারো পাহাড়ের কোল থেকে

ঘুরে এলাম গারো পাহাড়ের কোল থেকে

– – হাফিজ রহমান,

কাঁকশিয়ালী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠন। প্রতি বছর আমাদের ভিন্নসব আয়োজন থাকে- থাকে সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলা-ধুলা, ভ্রমণ ইত্যাদি। সেই সূত্রে এবছরের ভ্রমনের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রাকৃতিক নৈসর্গের লীলাভূমি গারো পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা পাহাড়, হাওড় আর আদিবাসীদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনা। দর্শনীয় স্থান হিসেবে নেত্রকোনার খ্যাতি রয়েছে, এখানে ছিল অনেক প্রাচীন স্থাপত্য যার অধিকাংশই আজ ধ্বংস প্রাপ্ত। বর্তমানে নেত্রকোণায় পর্যটকদের মূল আকর্ষণের স্থান হল সুসং দূর্গাপুর যা একসময় সুসং রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের এবারের যাত্রা এই সুসং দূর্গাপুরেই।

১৩ই মার্চ, ২০২০। কাঁকশিয়ালীর সকল সদস্য রাতে একত্রিত হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মলচত্বরে। রাত ১.০০টায় আমাদের বাস ছাড়া হবে, সবার মধ্যে উৎফুল্লতা, উত্তেজনা এবং অজানা কে জানা ও চেনার প্রবল আকাংক্ষা বিরাজ করছে। কাঙ্ক্ষিত সময়ে আমাদের বাস গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। আমরা প্রায় পঞ্চাশ জন। ভোরবেলা সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই আমাদের বাস এসে থামল এক্কেবারে নেত্রকোনার বিরিশিরি কালচারাল একাডেমীর সামনে। পাশের উৎরাইল বাজারে “ভাই ভাই মুসলিম হোটেল” থেকে ডিম পরোটা খেয়ে একটু চাঙ্গা হলাম। এরপর পায়ে হেটে বিখ্যাত সোমেশ্বরী নদীর উদ্দেশ্যে হাটা শুরু। মেঠোপথ, বালুর চর ডিঙিয়ে সোমেশ্বরীর ওপরে বাঁশের তৈরী দীর্ঘ সেতু পেরিয়ে শিবগঞ্জ বাজার পৌঁছালাম। যেহেতু শীত প্রায় শেষের দিকে, সোমেশ্বরীর পানিও কমে রবীন্দ্রনাথের “ছোট নদী”র হাঁটুজলে এসে ঠেকেছে। তবে বর্ষায় সোমেশ্বরী ঠিকই তার যৌবন ফিরে পায়।

শিবগঞ্জ বাজারে যেতেই দেখা মিলল অনেক দূর পর্যন্ত সারি সারি রাস্তার ধারে দাড়ানো ব্যাটারীচালিত ইজিবাইক। আমরা তাদের মধ্যে সাতটাকে আমাদের বাহন হিসেবে গ্রহণ করলাম। চুক্তি হলো, সবগুলো দর্শনীয় জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে প্রতিটার ভাড়া সাড়ে চার’শ টাকা।  অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের ছোট্ট বাহন আমাদের নিয়ে গেল বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পে, অনিন্দ্য সুন্দর ক্যাম্পের পুরোটি নদী তীরে উচু পাহাড়ী টিলার ওপর স্বগর্বে দাড়িয়ে আছে। ক্যাম্পের পাশ ঘেঁষে নদীতে নেমে গিয়েছে একটা সিঁড়ি, অদূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সবুজ আর কালোর মিশেলে গড়ে ওঠা পাহাড়গুলো যেন জীবন্ত হয়ে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

বিজিবি ক্যাম্প থেকে পায়ে হেঁটে পিছনের দিকে আসলাম, এবার কমলার পাহাড়ে যেতে হবে। পাহাড়ের নাম শুনলেই আমার মধ্যে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করে সবসময়। কমলার পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে কিছু ভাসমান দোকান যেগুলোতে বিক্রি হচ্ছে সব ভারতীয় জিনিসপত্র- বিভিন্ন ধরনের চকলেট, আচার, মিঠাই, সাবান, পারফিউম, চুড়ি, খোঁপা আরো কত কি।

পাহাড়ে ওঠার জন্য উপরের দিকে আঁকাবাকা সর্পিল পথ উঠে গেছে একদম চূড়া পর্যন্ত। সেই পথে উর্ধ্বমুখী হাঁটা শুরু করলাম সবাই, অনেকে তো অল্প হেঁটেই হাঁফাতে হাঁফাতে শেষ! আমরা কয়েকজন পাহাড় টপকে চলে গেলাম অপর প্রান্তে। ধীরে ধীরে অপর একটা পাহাড়ে কাছে চলে এলাম। এসব পাহাড়ে ওসমতলে মূলত গারো এবং হাজংদের বসবাস।

হঠাৎ চোখে পড়ল পাহাড়ের নীচ দিয়ে ছোট্ট একটা পানির প্রবাহ বেরিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে অবলোকন করলাম, স্বচ্ছ পানি ধীর গতিতে পাহাড়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসছে। একটা পানি তোলার ছোট পাত্রও ওখানে রাখা। আমরা স্বচ্ছ শীতল পানিতে হাত মুখে ধুয়ে উঠেছি এমন সময় একজন নারীর আবির্ভাব- তিনি গারো কি হাজং তা ঠিক বলতে পারবনা। দৃশ্যতঃ তিনি রেগেমেগে আগুন, ভাষা সবটুকু না বুঝলেও যতটুকু আমরা বুঝতে পারলাম তার সারমর্ম হলো- আমরা কেন পানি পাত্র দিয়ে না তুলে সরাসরি পানিতে হাত দিয়েছি, এটাই ওদের খাবার পানির একমাত্র উৎস। অপরাধীর মত ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ওনার সাথে এইসব এলাকা, তাদের বসবাস ইত্যাদি বিষয়ে কিছু কথাবার্তা হলো আমাদের। তিনি বাংলা এবং তাদের নিজস্ব ভাষার মিশেলে যে উত্তর দিয়েছিল তার সবটা অবশ্য দুর্বোধ্য ছিলনা আমাদের কাছে।

ওখান থেকে বিদায় হয়ে কমলা পাহাড়কে পুনরায় অতিক্রম করে চলে এলাম রাস্তায় যেখানে আমাদের বাহন অপেক্ষায়। কেও কেও আচার, চকলেট এবং অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে নিল। দর্শনে গেলাম রানিখৈংয়ে শতবছরের পুরোনে সাধু যোসেফের ক্যাথলিক চার্চ। চার্চটি নির্মিত হয়েছে একটি উচু টিলার ওপরে। সত্যিই মনোমুগ্ধকর, চার্চের চারিপাশে ঘিরে রয়েছে হাজারে হাজার ঔষধি সহ বিভিন্ন বৃক্ষ। এবারের গন্তব্য নেত্রকোনার সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্থান বিখ্যাত চিনা মাটির পাহাড় এবং সাদা মাটির পাহাড়।

চিনা মাটির পাহাড়ে যাওয়ার পথিমধ্যে বহেড়াতলিতে চোখে পড়ল সৌন্দর্যমন্ডিত হাজং মাতা শহীদ রাশিমনির স্মৃতিসৌধ। যিনি ১৯৪৬-৫০ পর্যন্ত চলা বৃটিশ ও জমিদার বিরোধী টংক এবং কৃষক আন্দোলনের প্রথম শহীদ। ধানখেত মাড়িয়ে, সরিষাখেত ছাড়িয়ে সূর্য যখন মাথার ওপর ছুঁই ছুঁই করছে, তখন আমরা পৌঁছুলাম চীনামাটির পাহাড়ে। প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়েছে বৈচিত্রময় এই এলাকা। পাহাড়ের গায়ের লালচে, হলুদ, কালো, গোলাপী চিনা মাটির রং এবং পাহাড়ের নীচে ছোট ছোট হ্রদ যেগুলোর সবুজাভ নীল, লাল, সাদা পানি আমাদের মনকে সত্যিই আন্দোলিত করে তুলেছিল। সে সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। ইংরেজি সিনেমাগুলোতে দেখা পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ঝর্ণায় সৃষ্ট হ্রদের মত মনে হবে আপনার কাছে।

প্রথম হ্রদ থেকে আরো কিছুদূর সমতল ভূমি পায়ে দলে অন্য পাহাড়ে পৌঁছুলাম। সেখানে হ্রদের নীলাভ পানিতে এক খানা নৌকা নিয়ে মাঝির উপস্থিতি পূর্নিমার চাঁদ হাতে পাওয়ার মত ছিল আমাদের কাছে। দুটো টিলার মধ্যবর্তী হ্রদে নৌকায় ঘুরতে জনপ্রতি খরচ ১০ টাকা। চিনা মাটির পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো দূর্গাপুর অঞ্চল দেখে মনে হলো সবুজের সমারোহে পদার্পণ করেছি। এটা একটা খনিজ অঞ্চল যা, ছোট-বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৬০০ মিটার প্রস্থ। এখানকার চিনামাটি সিরামিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়৷ যে পরিমাণ চিনা মাটি এখানে মজুদ আছে তা দ্বারা বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল তিন’শ বছর পর্যন্ত যোগান দেওয়া যাবে।

প্রচুর গরমে আমরা ঘেমে নেয়ে শ্রান্ত হয়ে গেছি তখন। স্থানীয় দোকান থেকে শসা এবং বরফে রাখা পানি পান করে রওয়ানা দিলাম সোমেশ্বরী নদীর দিকে। সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হওয়ার মতো। এ নদীর সাথে প্রেম হওয়া আবশ্যক। নদীর একপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পাহাড়। পুরো পাহাড়ই সবুজের চাদরে মাখা। স্বচ্ছ পানির এই নদীতে পাহাড় যেন আয়না দেখছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্ছুরীছড়া, বাঙ্গাছড়া প্রভৃতি ঝরনা ও পশ্চিম থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি। সাদা মাটির পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে অপরুপ নীলের উৎস এ নদী। সোমেশ্বরীর দীর্ঘ বিস্তৃত সিলিকা বালুর চরে হেটে নদীতে নেমে গেলাম হৈ-হুল্লোড় করে।নেত্রকোনা আসব আর সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ পানিতে জলকেলি করবনা তা কি করে হয়। দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো নদীতে। পুরো নদীর তলদেশ থেকে শুর করে দীর্ঘ তীর সিলিকা বালুতে পরিপূর্ণ। রোদে বালির উজ্জ্বলতা সোমেশ্বরীর রুপকে আরো বর্ধিত করেছে। জায়গায় জায়গায় ড্রেজিং মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দূর-দূরান্তে দেখা গেল ছোট-বড় ট্রাক বালু বোঝাই করে চর দিয়ে ধুলি উড়িয়ে চলে যাচ্ছে।

সবশেষে ফিরে এলাম, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিতে।হারিয়ে যেতে বসা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৭৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। গাছ-গাছালীর সমন্বয়ে সাজানো একাডেমীতে রয়েছে জাদুঘর, গবেষণাগার এবং লাইব্রেরী। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ব্যবহৃত বিলুপ্ত প্রায় জিনিসপত্র জাদুঘরের শোভাবর্ধন করেছে। এখানে একটা সুন্দর অডিটোরিয়ামও চোখে পড়ে।

বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফেরার পথে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠের পাশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কে হলো আমাদের যাত্রা বিরতি। যেখানে ক্যাম্পাসের সিনিয়র কাস্টম কর্মকর্তা সাইফুল ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পার্কটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে। নদী পার হয়ে ওপারেঅল্পসময়ের আড্ডা শেষে রাতের জন্য হালকা নাস্তা সেরে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে শ্রান্ত মনে বাসের সীটে গা এলিয়ে দিতেই নেত্রকোনার নৈসর্গিক প্রকৃতি, স্রষ্টার অপারসৃষ্টির স্মৃতি যেন হৃদয়ের গভীরে মুগ্ধতার শীতল পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেল। পাহাড়গুলো জীবন্ত হয়ে যেন ডেকে বলল- আবার এসো বন্ধু।

-হাফিজ রহমান
শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
hafij0121@gmail.com

Leave a Reply