বেনাপোল প্রতিনিধি:
সীমান্তবর্তী শহর বেনাপোলের দীঘিরপাড় (ভববেরবেড় মৌজা) এলাকায় 'আননূর একাডেমি' নামের একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চরম শিক্ষা বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবহনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত পড়ার সুযোগ না দিয়ে চড়া ফি আদায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অনৈতিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে চারতলা ভবন ভাড়া নিয়ে মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি কয়েকজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটিতে নার্সারি শ্রেণি থেকেই হিফজ ও বাংলা লাইনের মাসিক বেতন শুরু হয় ৩,০০০ টাকা থেকে। শ্রেণি বাড়ার সাথে সাথে বেতনের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। এমনকি হিফজ বিভাগে পড়া শিক্ষার্থীদেরও মাসিক বেতন দিতে হয় ২,০০০ টাকা।
আবাসিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে খরচের হার আরও বেশি। নির্দিষ্ট মেন্যু অনুযায়ী প্রতি শিক্ষার্থীর খাবারের বিল দিনে ১১৬ টাকা ধরে মাসে দাঁড়ায় ৩,৪৭০ টাকায়। এছাড়া পরীক্ষা ফি সহ নানা অজুহাতে অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। অভিভাবকদের মতে, মফস্বল শহরে এই ধরনের আকাশচুম্বী ফি আদায় করে লক্ষ লক্ষ টাকার শিক্ষা বাণিজ্য চালানো হচ্ছে, যেখানে দরিদ্র বা মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা (স্কুল বাস) অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো সুব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো রোববার সকালেও ইজিবাইকে গাদাগাদি করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনা হচ্ছে। গাতীপাড়া দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইকে (চালক মুরাদ হোসেন) ধারণক্ষমতার তোয়াক্কা না করে ১৩ জন কোমলমতি শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসতে দেখা যায়। ব্যস্ততম যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে স্কুলটি অবস্থিত হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজিবাইক চালক মুরাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বেপরোয়া মন্তব্য করেন, "এতে অসুবিধার কী আছে? দেশে কি কোনো আইন আছে নাকি! আমি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চলবো, আপনারা পারলে কিছু করেন।"
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের একটি দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ভিডিওটি মুছে ফেলার জন্য স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মীকে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন মহল থেকে ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর বেলা ১টার দিকে স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, ইজিবাইক চালকদের নিয়ে বৈঠকে বসেছেন একাডেমির শিক্ষকরা। শিক্ষার্থী পরিবহনে ঝুঁকি ও উচ্চ ফির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, "আমরা স্কুলে শিক্ষার্থী আনার জন্য সরাসরি কোনো চুক্তি করি না। অভিভাবকরা ইজিবাইক চালকদের সাথে চুক্তি করেন। তাই এই যাতায়াতের বিষয়টি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।" তবে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই এভাবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করে বলে তিনি স্বীকার করেন।
প্রতিষ্ঠানটির চরম অব্যবস্থাপনা, আকাশচুম্বী ফি আদায় এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়টি সম্পর্কে শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-কে অবহিত করা হয়েছে। ভিডিওটি দেখেছেন জানিয়ে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে যশোর জেলা প্রশাসক, যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার, শার্শা উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
মো: আনিছুর রহমান