খুলনার মহেশ্বরপাশা কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের (সিএসডি) ম্যানেজার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে নিম্নমানের ধান-চাল সংগ্রহ, খাদ্যশস্যের গুণগত মান নিয়ে অনিয়ম, গুদাম থেকে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য বের করে বিক্রি এবং বদলি-পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গত আড়াই বছর ধরে দায়িত্ব পালনকালে এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলাকালে নিম্নমানের ধান ও চাল সংগ্রহ করে মহেশ্বরপাশা সিএসডির নির্দিষ্ট একটি গুদামে মজুত রাখা হতো। সম্প্রতি গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মহেশ্বরপাশা সিএসডি থেকে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা খাদ্যগুদামে পাঠানো ৬০ টন চাল সেখানকার গুদাম ইনচার্জ ফেরত পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চালের মান নিয়ে আপত্তির কারণে সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে চালের প্রকৃত মান, ফেরত পাঠানোর কারণ এবং এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে মান পরীক্ষার প্রতিবেদন ও পরিবহনসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গুদাম ইনচার্জদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে বিভিন্ন উপজেলা খাদ্যগুদামে পরিবহন ঠিকাদারের বরাদ্দ কিংবা কর্মসূচির চাল-গমের বাইরে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য বের করে বাইরে বিক্রি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ উপার্জনের অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তবে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য বের করা, বিক্রি কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
বদলি-পদায়ন ঘিরেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
মহেশ্বরপাশা সিএসডির ম্যানেজার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে দায়িত্ব পালন ও বদলির ক্ষেত্রে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, বদলি ও পদায়নের আদেশ, আর্থিক লেনদেনের সম্ভাব্য নথি এবং খাদ্যশস্যের মজুত, পরিবহন ও বিতরণসংক্রান্ত হিসাব খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই।
এর আগে খুলনার খাদ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদন কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই ও যথাযথ তদন্ত জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) এবং বিভাগীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট খাদ্য কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চাইলে তাঁরা জানান, তাঁরা কয়েক মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী সময়ে এ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম তাঁদের নজরে আসেনি।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম নজরে না আসার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দিয়ে আগের আড়াই বছরের অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অতীতের নথিপত্র, মজুত ও বিতরণের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের রেকর্ড পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ অস্বীকার ম্যানেজার মোশারফের
এ বিষয়ে মহেশ্বরপাশা কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের (সিএসডি) ম্যানেজার মোশারফ হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিগত আড়াই বছরে এই সিএসডিতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।” অর্থাৎ, তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তদন্তের দাবি
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে মহেশ্বরপাশা সিএসডির ধান-চাল সংগ্রহ, মজুত, পরিবহন ও বিতরণ কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে পাংশা উপজেলা খাদ্যগুদামে ফেরত পাঠানো ৬০ টন চালের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, মজুত রেজিস্টার, পরিবহনসংক্রান্ত নথি, বরাদ্দ ও বিতরণের হিসাব এবং বদলি-পদায়নের আদেশ যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সহায়তা হতে পারে।
খাদ্যশস্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং সরকারি সম্পদের সম্ভাব্য অপব্যবহার রোধ করা জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ প্রতিনিধি (খুলনা)